Mental health মনের যত্ন

আত্মহত্যার কি কোনও পূর্বাভাস পাওয়া যায়?

Suicide

কখন মানুষ ভাবে আর প্রয়োজন নেই, এই চারিদিকের আলোছায়া, আনন্দ-দুঃখ, কান্না-হাসির পালার? কখন মনে হয় নিজেকে সরিয়ে ফেলি লুকিয়ে ফেলি অন্ধকারে? আত্মহত্যার কি কোনও পূর্বাভাস পাওয়া যায়? সে বিষয়ে জানালেন- ডঃ তন্ময় মিত্র

নিশ্চিত কোনো লক্ষণ

তেমন নিশ্চিত কোনো লক্ষণ না পাওয়া গেলেও, গবেষকেরা বলছেন, আত্মহত্যার পরিকল্পনা করছে এমন মানুষ অনেকসময় তার অনুপস্থিতিতে অন্যেদের উপর যে আর্থিক বা সামাজিক দায়-দায়িত্ব বর্তাবে তার ব্যবস্থা করতে শুরু করে। যেমন-

বিষয় সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা,

আত্মীয়স্বজনদের শেষবারের মতো দেখা করা,

আত্মহত্যার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র (দড়ি, ওষুধ বা অন্যান্য) জোগাড় করা ইত্যাদি।

এছাড়া হঠাৎ বিষন্নতা বা বিমর্যতা বেড়ে যাওয়া,

মৃত্যুর কথা বলা বা আলোচনা (এখন আমি রয়েছি, কিন্তু আমি যদি না থাকি… ইত্যাদি)।

কিভাবে বোঝেন মনোবিদরা

অনেকেই ভাবেন এই আত্মহত্যার পরিকল্পনা হয়তো মনোবিদ বা মনোচিকিৎসকেরা আগের থেকেই জানতে পারেন রোগীর সাথে সরাসরি কথা বলে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীরা তাদের এই আত্মহত্যার পরিকল্পনা করার কথা লুকিয়ে রাখে সযত্নে, কারোকেই আঁচ পেতে দেয়না, এমনকি মনোবিদ বা মনোচিকিৎসককেও নয়।

বরং বাড়ির কেউ বা নিকট আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবদের কারুর কাছে এই ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হলেও হতে পারে।

সাধারণত আত্মহত্যার বাসনার পূর্বলক্ষণের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকে বিষন্নতা, বিমর্যতা (ডিপ্রেশন) বা উদ্বেগভয় (অ্যাংজাইটি)।

এছাড়া মদ বা অন্য নেশা

ক্রমাগত নিদ্রাহীনতা (ইনসমনিয়া),

তীব্র উত্তেজনা আত্মহত্যার ইচ্ছাকে জোরালো করে তুলতে পারে।

আগের ভালো লাগার জিনিসগুলোতে (বই পড়া, টিভি দেখা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারা) ক্রমশ অনীহা (অ্যানহিডোনিয়া),

ক্রমাগত নেগেটিভ চিন্তা ইত্যাদি দেখা গেলে আত্মহত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত।

একটা কথা মাথায় রাখা উচিত, যে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে তার আবার এই চেষ্টা করার সম্ভাবনা বেশি।

আত্মহত্যার প্রতিরোধ কী সম্ভব?

আত্মহত্যার সমস্যা নিয়ে যারা সরাসরি এসেছেন শুধু তাদেরই নয়, অন্যান্য মানসিক সমস্যা নিয়ে যারা আসেন, তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা বা সম্ভাবনা দেখে নেওয়া মনোবিদ বা মনোচিকিৎসদের কাজ।

এটা করার জন্য মানসিক অস্থিরতা বা বৈকল্য মাপ করা হয়।

বিষন্নতা বা বিমর্যতা, টেনশন বা উদ্বিগ্নতা, ভয় বা আতঙ্ক এইগুলি মাপার জন্য সাইকোমেট্রিক স্কেল আছে।

তাতে অনেকটা পরিমাপ করা সম্ভব এই মানসিক অবস্থার।

এছাড়া বিভিন্ন নেশা, কোনোও আকস্মিক দুর্ঘটনা বা বড়ো ক্ষতি (যেমন নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু বা ব্যবসায়ে আর্থিক ধাক্কা) আত্মহত্যার চিন্তা আনতে পারে।

এছাড়াও আছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন (বিশেষ করে রোমান্টিক সম্পর্কের অবনতি বা ছাড়াছাড়ি)।

সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারলে প্রতিরোধ সম্ভব

কিন্তু বেশিরভাগ সময় এই সুযোগ মেলে না।

এক্ষেত্রে ‘নীরবতা’ হল সবচেয়ে বড় সমস্যা। অর্থাৎ যে মানুষটি নিজেকে শেষ করার ভাবনাচিন্তা করেছেন, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বললে তার মনোভাব কখনো কখনো আঁচ করা যায়।

এক্ষেত্রে অবশ্যই সেরকম ঘনিষ্ঠতা থাকার প্রয়োজন, নাহলে মানুষটি মুখ খুলতে চাইবেন না।

মনোবিদ বা মনোচিকিৎসকেরা এই ধরণের কথাবার্তা শুনতে অভ্যস্ত – তারা হয়তো বিমর্ষ বা উত্তেজিত মানুষটির মনের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে পারবেন।

আশা বা আনন্দ সে যতই সামান্য হোক, এই মানুষগুলি সেগুলি পেলে আবার সুস্থ চিন্তায় ফিরতে পারে।

হাতের কাছে অতিরিক্ত ওষুধপত্র না রাখা, একা বেশিক্ষণ না রাখা, এই সব সতর্কতাগুলি মেনে চলা দরকার।

মনে রাখা দরকার, নেশা থেকেও দূরে রাখা প্রয়োজন।

আমাদের প্রয়োজন স্বচ্ছ চিন্তাশক্তি, মনোরোগের সময়মতো চিকিৎসা এবং এক সদর্থক পরিবার।

চারিদিকে আনন্দে থাকার ছোট্ট উপকরণগুলিকে কুড়িয়ে নেওয়ার অভ্যাস, এই সর্বনাশের পথে পা বাড়ানো মানুষগুলিকে হয়তো আটকাতে পারে।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

To Top