Mental health মনের যত্ন

নতুন প্রজন্মকে শেখান জীবন ও সম্পর্কের মূল্যবোধ

family infrastructure

পরিবারটা আজ বড্ড ছোটো হয়ে গিয়েছে। মেরে কেটে দাদু কিংবা দিদিমা এবং সঙ্গে বড়জোর একজন পরিচারিকা। আত্মীয় বলতে যারা রয়েছেন, সময়ের অভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয় না। ফলে বাড়িতে বিয়ে লাগলে তবেই একে অপরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ মেলে। তাও বছরে দু’একবার।

বর্তমান পারিবারিক পরিকাঠামো

কিন্তু কিছুবছর পরে বা আরও একটা কি দুটো পুরুষ পরে সেই আত্মীয় বা আপনজনেদের রীতিমতো খুঁজে বেড়াতে হবে। দুরবীক্ষণ যন্ত্র লাগালে তবে দেখা মিলবে তাদের। কারণ সভ্যতা এবং অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে আজ আমরাও অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছি।

ঘরে ঘরে আজ চাকুরিজীবী দম্পতি এবং সর্বসাকুল্যে একটি সন্তান। বাবা-মা বা শ্বশুর-শাশুড়ি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই বললেই চলে। ফলে একান্নবর্তী পরিবার ছোটো হতে হতে কার্যত হারিয়েই যাচ্ছে সমাজ থেকে।

একান্নবর্তী পরিবারের অবক্ষয়

আজ তাই আমাদের আশেপাশে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র পরিবারেই দাদু-ঠাকুমা কিংবা জেঠু-জেঠিমা শব্দগুলি শুনতে পাই। সেই দিন আসতে আর খুব বেশি দেরী নেই যখন আক্ষরিক অর্থে আত্মীয় বলতে আর সম্পর্কের অস্তিত্বই বেঁচে থাকবে না। ঘরে ঘরে কেবল রয়ে যাবে বাবা-মা ও সন্তান কিংবা কোনও কোনও বিবাহিত অথবা অবিবাহিত দম্পতির জীবনে সন্তানও হয়ে উঠবে অপ্রয়োজনীয়।

বিবাহিতদের ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী কিংবা অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে পরিবারের আকৃতিটা আরও ছোটো হয়ে যাবে। অন্যদিকে সন্তান বড় হওয়ার পড়ে কর্মসূত্রে বিদেশে চলে গেলে বাবা-মা হয়ে ওঠে উটকো বোঝা।

ব্যস্ত জীবনে তাদেরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারার ফলে বাবা-মায়ের শেষ ঠাঁই হয়ে ওঠে বৃদ্ধাশ্রম। এভাবেই পরিবারের চেহারা বা আকৃতি আর কিছুদিন পরে তিন বা চার থেকে কমে দাঁড়াবে দুইয়ে।

সম্পর্কের গুরুত্ব

মানুষ তো সমাজবদ্ধ জীব, তাই সে একা বাঁচতে পারে না, সেক্ষেত্রে আত্মীয় পরিজনের গুরুত্ব অপরিসীম।

ব্যস্ততার মধ্যে নিজেদের পরিবারের জন্যই যেখানে সময় নেই, সেই জায়গায় বিপদে-আপদে সবসময়ে প্রতিবেশী হিসাবে পাশে দাঁড়ানোটা আরোই কঠিন। ফলে কমে যাছে আত্মীয় কিংবা নিজের লোকেদের গুরুত্ব।

আমাদের উত্তরসুরী যাদের জীবনে এখনও অবধি দাদু-দিদা, জেঠু-জেঠিমা অথবা মাসি-পিসি এইসব শব্দগুলির অস্তিত্ব রয়েছে, তাদেরকে শেখান সম্পর্কের মূল্যবোধ।

ভালোবাসার অস্তিত্ব এবং সম্পর্কের মুল্যবোধ

আমাদের জীবনে উন্নতির পথে আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ শব্দের মতোই অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ একটি শব্দ হলো ভালোবাসা।

আর এই ভালোবাসা শব্দটির হাত ধরেই জীবনে চলার পথে তৈরি হয় সম্পর্ক।

রক্তের সম্পর্ক বলতে যা বোঝায়, সেই মামা-মাসি-পিসি কিংবা দাদু-দিদার মতো মানুষগুলির আজ অস্তিত্ব সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে।

নিউক্লিয়ার পরিবার হওয়ার ফলে ঘরে ঘরে আজ একটি সন্তান।

ফলে তাদের কোনও দাদা বা দিদি না থাকায় পরবর্তী প্রজন্ম মামা বা মাসি এইসব সম্পর্কগুলো থেকে বঞ্চিত হতে চলেছে।

সেক্ষেত্রে যতটুকু পারা যায় এই সম্পর্কগুলোকে আগলানো দরকার।

ভবিষ্যতে কখনও পরিস্থিতি অন্যরকম হলে দাদু, দিদা, মামা মাসিদের মতো এই সব সম্পর্কগুলো হয়ে উঠবে অবলম্বন বা নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের সমস্যা

অনেক শিশুই ছোটোবেলায় বাবা কিংবা মা-কে হারায়। ফলে নিউক্লিয়ার পরিবারগুলোতে তখন দরকার পড়ে এমন কাউকে যে, পাশে দাঁড়িয়ে হাতটা ধরতে পারবে কিংবা চোখের জল মুছে বুকে টেনে নিতে পারবে। যেমন— অনেকসময়ে পিতৃহারা শিশুর জীবনে বাবার বিকল্প হিসাবে কিছুটা হলেও পথ দেখিয়ে থাকে মামা কিংবা জেঠু-কাকু। তাই প্রতিটা ক্ষেত্রেই সম্পর্ককে মূল্য দিতে শেখাটা একান্ত জরুরি।

নতুন প্রজন্মকে সম্পর্কের মূল্যবোধ শেখানোটা জরুরি হওয়ার আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো – সমাজ থেকে বৃদ্ধাশ্রম নামক শেষ ঠাঁইয়ের সংখ্যা কমানো। ছোটোবেলায় যখন বাবা-মা হাত ধরে হাঁটতে শেখায়, পড়ে গেলে কোলে তুলে নিয়ে ব্যথার জায়গায় ওষুধ লাগিয়ে দেয়, তখন বড় হওয়ার পরে প্রতিটি সন্তানের উচিত বাবা-মায়ের সেই স্নেহ-ভালোবাসা-যত্নের সমান মূল্য দেওয়া।

মানবিকতা মূল্যবোধ

মান আর হুঁশ মিলিয়ে যখন মানুষ, তখন সেই হুঁশ হারালে চলবেনা। সন্তান হিসাবে বাবা-মায়ের কাছে একদিন যতটা পেয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি সম্মান, শ্রদ্ধা ও যত্ন পাওয়া উচিত বৃদ্ধ বাবা-মায়ের।

সুতরাং জীবনের একেবারে শুরুতে তৈরি হওয়া এই সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পর্কের মূল্যবোধ সবচেয়ে আগে শিখতে হবে। তবেই আত্মীয়-পরিজন কিংবা প্রতিবেশী কোনও কাকু-জেঠু বা দাদু-দিদাকে যথাযথ সম্মান-শ্রদ্ধা দিতে পারবে, এবং বিনিময়ে তাদের থেকেও মিলবে অফুরান ভালোবাসা, যা জীবনে চলার পথে ভাঙা-গড়া ও উত্থান-পতনের সময়ে ভরসা জোগাবে, খারাপ সময় পার করতে হয়ে উঠবে কান্ডারী।

লেখকডাঃ কেদার রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

To Top