Mental health মনের যত্ন

খিটখিটে ব্যবহার আমাদের কতটা ক্ষতি করে ?

খিটখিটে ব্যবহার

একটি মানুষের অনুভূতির জগতের প্রতিফলন ঘটে তার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। একজন শান্ত চরিত্রের মানুষ সব সময় খুব বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করেন, তার মধ্যে একটা স্টেবিলিটি থাকে, তার সঙ্গে খুব সহজভাবে মেলামেশা করা যায়।

আবার একজন বদমেজাজি মানুষের বন্ধু কেউ হতে চায় না। তার মেজাজের ঠিক-ঠিকানা নেই। তার সঙ্গে মানিয়ে চলা খুব শক্ত ব্যাপার। খিটখিটে মেজাজের এই মানুষটি যখন-তখন রেগে যায়। তার ব্যবহার দেখে মনে হয়, মস্তিষ্কের কোথাও কিছু সমস্যা রয়েছে।

খিটখিটে ব্যবহার কেন হয়?

সাধারণত অপজিসনাল ডিফায়ান্ট ডিজঅর্ডার (ওডিডি), মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার (এমডিডি) এবং ম্যানিয়া বাইপোলার ডিজঅর্ডার)-র মতো মানসিক অসুখগুলিতে মানুষ খিটখিটে ব্যবহার করে।

বয়ঃসন্ধির আলোছায়ায়

বয়ঃসন্ধির সময় কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় খিটখিটে ব্যবহার করে । অনেকে হঠাৎ যখন-তখন সঠিক কোনও কারণ ছাড়াই রেগে যায়। কোনও বিশেষ ঘটনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ধৈর্য ও মনের স্থিরতা এই বয়সে থাকে না।

খিটখিটে মহিলারা

মেয়েদের জীবনে প্রোজেস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে স্বাভাবিক রিপ্রোডাকটিভ বয়সে প্রতি মাসে আসে বর্ষা। বেশ কিছু মহিলা মাসিক খতুস্রাব শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে উদ্বেগ ও অবসাদে ভোগেন। অনেকেই এ সময়টায় খুব খিটখিটে মেজাজের হয়ে যান।

একইভাবে মধ্যবয়সে নারীর জীবনে যখন মাসিক খতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, তখনও দেখা যায় নানারকম দৈহিক ও মানসিক সমস্যা। বিশেষ করে এই অবস্থায় অবসাদ ও খিটখিটে মেজাজের পরিচয় সকলেই পেয়ে থাকেন।

মদ্যপান অন্যান্য নেশা

নেশার সময়ে নেশার বস্তুটি পেটে না পড়লে, তখন মেজাজ স্বাভাবিকভাবেই খিটখিটে হয়ে যায়। রাগ বেড়ে যায়। অনেকে ভায়োলেন্ট হয়ে যান।

মানসিক চাপ

আমরা সকলেই জানি, একজন মানুষের দৈহিক ও মানসিক চাহিদাগুলি সহজভাবে পূরণ হয়ে গেলে জীবন খুব সুন্দরভাবে শান্তিতে অতিবাহিত হয়। কিন্তু বাস্তবে চারপাশের পরিবেশ থেকে আসা বাধাবিপত্তি এবং ব্যাক্তিগত জীবনের নানারকম সংকট সমস্যা করে, তখন তৈরি হয় মানসিক চাপ।

অনিদ্রা

খিটখিটে মেজাজের পিছনে আর একটি বড় কারণ অনিদ্রা। বিছানায় শুয়ে চোখে ঘুম না আসা এক প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি । দেখা গেছে বেশিরভাগ মানসিক অসুখের প্রথম উপসর্গ এই নিদ্রাহীনতা।

কী কী ক্ষতি হতে পারে?

  • খিটখিটে অবস্থায় যে কোনও মানুষ কোনও যুক্তিযুক্ত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
  • বদমেজাজি ব্যবহারের ফলে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে নানারকম ভূল বোঝাবুঝি বাড়ে। সকলে ঘৃণা করে, এড়িয়ে যায়। খিটখিটে মানুষটি নিজের জীবনে একা হয়ে যায়।
  • উত্তেজিত অবস্থায় মারদাঙ্গা, হত্যা বা আত্মহত্যার মতো অপরাধমূলক ঘটনা ঘটতেই পারে।
  • খিটখিটে অবস্থায় মনের মধ্যে হাজাররকম টেনশন ও অ্যাংজাইটি জমা হতে থাকে, ফলে ব্লাড প্রেসার বাড়ে, হার্ট রেট বাড়ে। অতিরিক্ত উত্তেজনায় হার্ট অ্যাটাক কিংবা সেরিব্রাল অ্যাটাক হওয়ার  ঘটনা মাঝে মধ্যেই ঘটে।
  • অতিরিক্ত টেনশনে ডায়াবেটিসও হতে পারে।
  • অবিরত টেনশন ও অ্যাংজাইটিতে ভূগতে ভূগতে অনেকেই পেপটিক আলসার, মাইগ্রেন, টেনশন হেডেকের মতো নানারকম সাইকোসোমাটিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।
  • কেউ কেউ কম কিংবা বেশি খাওয়ার সমস্যায় ভোগে।
  • কারোর কারোর যৌন জীবনেও নানারকম দুর্বলতা দেখা যায়। জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও তৃপ্তি তারা উপভোগ করতে পারে না।
  • নিয়মিত খিটখিটে ব্যবহার করতে করতে চেহারায় এসে যায় নিষ্ঠুরতা মেশা এক ধরনের কাঠিন্য। অনেকের বাহ্যিক ব্যবহারেও অসংলগ্নতা দেখা যায়।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন

  • জীবনযাত্রা সরল করুন, উচ্চাশার প্রতিযোগিতায় নাই বা নামলেন।
  • নিয়মিত খেলাধুলো, ব্যায়াম বা যোগ করুন। ভালো লাগলে গান-বাজনা, কাব্য-সাহিত্য, শিল্পের মতো কোনও সৃজনশীল নান্দনিক অনুভূতিকে আশ্রয় করুন।
  • খিটখিটে ব্যবহারের পিছনে কোনও মানসিক বা দৈহিক কারণ থাকলে নির্দিষ্ট চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া উচিত।
  • একবার শান্ত মনে ভাবুন তো, আপনার রাগী রাগী নিষ্ঠুর মুখখানা ও উত্তেজিত ব্যবহার দেখে আপনার কাছের মানুষ, প্রতিবেশী কিংবা সহকর্মীরা আপনাকে ভয় পাচ্ছে, ঘৃণা করছে, এড়িয়ে চলছে, এই অবস্থাটা কি খুব সুখের?
  • কাছের মানুষকে ভালোবাসুন।
  • একমাত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই পারে রাগ-ঝগড়াঝাটি-অশান্তি- খিটখিটে ব্যবহার সব কিছু দূরে ঠেলে এই দুর্লভ মানবজীবনকে হিরন্ময় করে তুলতে।

লেখক- ডাঃ কেদার রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

To Top